“জ্ঞানের প্রদীপ মনে নাহি জ্বলে যার,
কখনো ঘুচেনা তাঁর ভ্রম অন্ধকার।”
“ধর্ম মানেই অত্তনো সভাবং ধারেতীতি ধম্মো”
অর্থাৎ নিজের স্বভাব মতে ধারণ করে বলে ধর্ম। ধর্ম কারো মতে চলেনা। আপন স্বভাব মতে চলে। “চতুসু অপায়েসু অপতমানো ধারেতীতি ধন্মো।” অর্থাৎ চতুর অপায়ে পতিত হতে না দিয়ে ধারণ করে বলে ধর্ম।
“ কুসল ভাবেথ, অকুশল পজহথ” অর্থাৎ কুশলকে বৃদ্ধি করো এবং অকুশলকে পরিত্যাগ করো। একেই বলে ধর্মানুদর্শন, ধর্মানুসরণ এবং ধর্মাশ্রয়।বুদ্ধ বলেছেন, “ ধম্মদীপ বিহরথ, ভিক্খবে! ধম্মসরণ অনঞঞা সরণ।” অর্থাৎ ধর্মের দীপ হয়ে বিচরণ করো। ধর্মের শরণ হল অনন্য শরণ। শ্রীসত্যনারায়ণ
গোয়েঙ্কার মতে, “বৌদ্ধ ধর্ম হলো আদর্শ জীবন শৈলী; সুখে থাকার বিশুদ্ধ পদ্ধতি, শান্তি লাভ করার বিমলপন্থা, সর্বজন কল্যাণপ্রদ আচার-সংহিতা যা সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য এক ও অভিন্ন।”
বুদ্ধ বলেছেন, “ যং কিঞ্চি সমুদযং ধম্মং সব্বত্থং নিরোধা ধম্মন্তি।” অর্থাৎ যা কিছু উৎপন্ন হচ্ছে তা নিরোধ করাই ধর্ম। এটাকে জানতে এবং বুঝতে হলে ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু ও ধর্মবোধ জাগ্রত করতে হবে।
ধর্মজ্ঞান কি?
সংক্ষেপে বলা যায় – পাপকর্ম পরিত্যাগ করা। যার নিকট ধর্মজ্ঞান উৎপ্ন্ন হয় সে আর পাপকর্ম করে না।
ধর্মচক্ষু কি?
এককথায় বলা যায় নির্বাণকে দর্শন করা। অন্ধকার রাতে যেমন হঠাৎ বিদ্যুতের আলো দেখা যায় ঠিক তেমনি ধর্মচক্ষুর দ্বারা নির্বাণের শান্তি জ্যেতিকে দেখা যায়।
ধর্মবোধ কি?
এককথায় মার্গফল নির্বাণ লাভ করা।
উক্ত তিনটি বিষয় লাভ করতে হলে বুদ্ধের মধ্যমমার্গ ধর্মচক্রের কৌশলশৈলী সম্পর্কে অভিজ্ঞতা থাকতে হবে ।
সেই কৌশল কি ? এই বিষয়ে অভিজ্ঞ বিদর্শন আচার্য শ্রীসত্যনারায়ণ গোয়েঙ্কা বলেন,
আমাদের ভেতরে প্রতি মুহূর্তে যে লোকচক্র চলছে তার থেকে মুক্তি পেতে হলে ধর্মচক্র প্রবর্তিত করতে হবে। লোকচক্র আমাদের যাবতীয় দুঃখের মূল। ধর্মচক্র সমস্ত দুঃখের নিরোধক।
“লোকচক্র কি?
লোকচক্র হচ্ছে মোহ, মূঢ়তা। লোকচক্র অজ্ঞান, অবিবেক এবং অবিদ্যা যার জন্য আমরা নিরন্তর আসক্তি এবং বিদ্বেষের যাঁতায় পিষ্ট হচ্ছি। আমাদের ছয়টি ইন্দ্রিয়-চোখ, কান, নাক, জিভ, শরীরের ত্বক এবং মন, এগুলোর ছয়টি বিষয়-রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ এবং কল্পনা; এদের পরস্পর সংস্পর্শ হতে থাকে, চোখের সঙ্গে রূপের, কানের সঙ্গে শব্দের, নাকের সঙ্গে গন্ধের, জিভের সঙ্গে রসের, ত্বকের সঙ্গে স্পর্শের এবং মনের সঙ্গে কল্পনার। বিষয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের সংস্পর্শ হওয়া মাত্রই চিত্তে কোন সংবেদনা (অনুভূতি) জাগে। যদি এই সংবেদনা আমাদের প্রিয় হয়, তাহলে তৎসম্বন্ধীয় বিষয় থেকে আমাদের আসক্তি উৎপন্ন হয়। যদি ঐ সংবেদনা অপ্রিয় হয়, তাহলে আমাদের দ্বেষ বা বিদ্বেষ উৎপন্ন হয়। আসক্তি উৎপন্ন হোক অথবা বিদ্বেষ উৎপন্ন হোক, দুটোই আমাদের মনে চাঞ্চল্য এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এতে সমতা নষ্ট হয়। বিষমতা উৎপন্ন হয়। দুঃখসন্ধি হয়। দুঃখ আরম্ভ হয়। ইহাই লোকচক্রের আরম্ভ। অজ্ঞানতা থেকে আমাদের মধ্যে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় তাই গভীর আসক্তিতে পরিবর্তিত হয়ে দূষিত ভবচক্রের রূপে বাড়তে থাকে, আমাদের ব্যাকুল, ব্যথিত করে এবং আমাদের দুঃখের সংসার বাড়াতে থাকে। এই ভবচক্রকে ধ্বংস করার জন্য আমাদের ভেতরে ধর্মচক্র জাগ্রত থাকা নিতান্তই আবশ্যক। যদি ধর্মচক্র জাগ্রত হয়, তাহলে বিবেক, বিদ্যা এবং সচেতনতা জাগে। যেমন কোন ইন্দ্রিয় এবং ইহার বিষয়ের পরস্পর সংস্পর্শের ফলে চিত্তে কোন সংবেদনা উৎপন্ন হয়, প্রিয়ই হোক বা অপ্রিয় হোক, সুখদ হোক বা দুঃখদ হোক-সেই রকম পাগলের মতো ঐ বিষয়ের প্রতি আসক্তি রঞ্জিত এবং দ্বেষ-দূষিত না হয়ে ইহার নশ্বর-নিঃসার স্বভাবকে জেনে প্রজ্ঞা এবং অনাসক্তিভাব জাগ্রত করা উচিত। এর দ্বারাই লোকচক্রের বা ভবচক্রের প্রবর্তন রুদ্ধ হয়। ইহার বিস্তার লাভ হয় না। ইহাই ধর্মচক্র প্রবর্তন। ধর্মচক্র প্রবর্তনের এটাই প্রত্যক্ষ লাভ। বিপশ্যনা সাধনার নিরন্তর অভ্যাসের দ্বারা নিজের অন্তর্মনে অনুভূত প্রত্যেক সংবেদনাকে জানুন এবং জেনে তাতে আসক্ত হবেন না। তটস্থ হয়ে থাকুন। ধর্মচক্র প্রবর্তিত রাখুন। ধর্মচক্র প্রবর্তিত রাখলে আমাদের মঙ্গল এবং কল্যাণই হবে।
বুদ্ধ পটাচারাকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন,
“পিতাপুত্র পরিজন কেহ না করে রক্ষণ,
নিজেই নিজের রক্ষক মৃত্যুন্জয়ী যে জন।”
এ কথা শুনে পটাচারা অর্হৎ হয়েছিলেন।আরো যাঁদের ধর্ম জ্ঞান , ধর্মচক্ষু ও ধর্মবোধ লাভ হয়েছিল তাঁদের জীবন ধন্য হয়েছিল।
যেমন Ascetic কৌন্ডণ্য ধর্মানুপস্সানা এবং confidence অনুশীলন করে , মহামতি ধর্মভান্ডাগারিক আনন্দ ভান্তে কায়ানুপাস্সানা( ইর্যাপথ) এবং সম্যক ব্যয়াম অনুশীলন করে , অঙ্গুলীমালা থের চিত্তানুপাস্সানা এবং সম্যক্ বাক্য, সম্যক কর্ম এবং সম্যক আজীব অনুশীলন করে , ভিক্ষুণী অনুপমা চিত্তানুপস্সানা এবং সম্যক আজীব অনুশীলন করে , ভিক্ষুণী ধর্মাদিন্না , কৃশাগৌতমী এবং পটাচারা ধর্মানুপস্সানা এবং confidence ( understand the reality of life) or rational faith অনুশীলন করে , রাহুলা কায়ানুপাস্সানা ( আনাপান স্মৃতি) এবং সম্যক ব্যায়াম অনুশীলন করে , প্রিন্স নন্দ চিত্তানুপস্সানা এবং ethical conduct ( সম্যক আজীব)অনুশীলন করে অর্হৎ হন। পূজনীয় বনভন্তে বলেন,
“চিরশান্ত হও সবে সদ্ধর্ম পুকুরে
স্নানে পরিষ্কার কর চিত্তের মুকুলে।”


