নামরুপের সহজ ব‍্যাখ‍্যা

যাওয়ার যে ইচ্ছা সেটা হচ্ছে নাম। যেটা বা যে যাচ্ছে সেটা বা সে হচ্ছে রুপ। নাম যেতে চাইছে বলে রুপকে যেতে হচ্ছে। নাম যদি যেতে ইচ্ছা না করত রুপ কখনো যেত না।মানুষ, আমি, তুমি, সে, পুরুষ, স্ত্রী,

প্রাণী, প্রজাপতি কিছুই আত্মা নয়, সবই নামরুপ, নামরুপই যাচ্ছে।

তদ্রুপ, দাঁড়ানোর ইচ্ছাটা নাম।দাঁড়ানোটা রুপ।মানুষ, আমি সবই নামরুপ।নামরুপই দাঁড়াচ্ছে।

বসতে ইচ্ছা করাটা নাম। বসাটা রুপ। মানুষ, আমি সবই নামরুপ । নামরুপই বসছে।

শোওয়ার ইচ্ছাটা নাম।শোওয়াটা রুপ। মানুষ, আমি, তুমি সবই নামরুপ। নামরুপই শুচ্ছে।

এভাবে যাওয়া, দাঁড়ানো, বসা, শোওয়া – এই ৪টি ঈর্যাপথ বা জীবের অবস্থান দেখানো হল। এগুলো ছাড়া অন‍্যান‍্য যেসব ক্রিয়া আছে সে গুলোকে ও আমাদের এভাবে জানতে হবে। যেমন : বাজারে কেনা-বেচা করা, চাষ করা, জমিতে জল সেচ করা, লাঙ্গল দিয়ে জমি কর্ষণ করা, ধানের জালা ফেলা, ধানের চারা গাছ তোলা, এবং আবার লাগানো, ঘাস কাটা, ঘাস তোলা, তুলো তোলা , তুলো পরিষ্কার করা, সুতো কাটা, তুলো ধুনো, সুতো সংগ্রহ করা, সুতোতে রং দেওয়া, সুতোকে তাঁতে বাঁধা, রান্না করা, ধান ভাঙ্গা, ক্ষেত থেকে সবজি তোলা, সংগ্রহ করা, কাঠ সংগ্রহ করা ইত্যাদি যাবতীয় বড় কাজ, ছোট কাজ, যে কাজই হোক না কেন কাজে স্মৃতি রাখতে হবে।স্মৃতি রেখেই আমাদের সব কাজ করতে হবে।

নামরুপকে ঠিক ঠিক ভাবে বুঝতে পারলে ৬২ প্রকার মিথ‍্যা দৃষ্টি ( পালি দীর্ঘ নিকায়ের ব্রক্ষজাল সূত্র দ্রষ্টব্য) থেকে মুক্ত থাকা যায়। সেই জন‍্য বলা হয়েছে:

“নামরুপানং য়থা’ব দস্সনং

দিট্ঠি বিসুদ্ধী’তি বেদিতব্বং।”

অর্থাৎ নামরুপকে ভাগ ভাগ করে আলাদা আলাদা যিনি দেখতে পারবেন, সেই ব্যক্তির কাছে সৎকায় দৃষ্টি ( অর্থাৎ আত্মাবাদ) ঘেঁষতে পারবে না।তাঁর জ্ঞান চক্ষু বিশুদ্ধই থাকবে।

কোন ব্যক্তি নামরুপকে ঠিক ঠিক ভাবে জানতে পারে তাঁর কাছে স্ত্রী বা পুরুষ নামরুপ মাত্র। স্ত্রী – পুরুষকে নামরুপ বলেই দেখছেন, স্ত্রী-পুরুষ বলে দেখছেন না।যেমন : কাঠের পুতুল। তাঁর কাছে ব‍্যক্তি পুরুষ ও নয় স্ত্রী ও নয়। এভাবে নামরুপ সম্বন্ধে যথার্থ উপলব্ধি যাঁর হয়েছে, যদি তিনি পৃথকজন বা সাধারণ ব্যক্তি ও হন, তথাপি তিনি দু:খ থেকে মুক্ত হয়ে সুখী হতে পারেন। সৎকায় দৃষ্টি ( আমি , তুমি ইত্যাদি আত্মাবাদ ) যত প্রবল হবে ব‍্যক্তি বিশেষের দু:খ ও তত বেড়ে যাবে। সেই জন্য বুদ্ধ বলেছেন –

“সক্কায- সমুদযা দুক্খসমুদযো,

সক্কায-নিরোধা দুক্খনিরোধো।”

সৎকায় দৃষ্টির উৎপত্তিতে দু:খের উৎপত্তি। সৎকায় দৃষ্টির ধ্বংসে, দু:খের ও ধ্বংস।

বিদর্শন জ্ঞান তিন প্রকার , যথা : ১) যথাভূত জ্ঞান, ২) সম‍্যক -দর্শন জ্ঞান এবং ৩) কঙক্ষাবিতরণ জ্ঞান।

যথাভূত জ্ঞান:-

পারমার্থিক দৃষ্টিতে ত্রিলোকের মধ্যে নাম এবং রুপ বাদে অন্য কিছু নেই। এটা জানাই যথাভূত জ্ঞান।

সম‍্যকদর্শন জ্ঞান:-

কর্মের কোন কর্তা নেই। আমি , তুমি , সে , পুরুষ, স্ত্রী, কোন কর্মকর্তা নেই। শুধু নামরুপই আছে।আবার কর্মের কোন ফল ভোগকারী ও নেই। আমি, তুমি, সে , পুরুষ, স্ত্রী বলে কর্মের কোন ফল ভোগকারী নেই।

শুধু নামরুপই আছে। নামরুপ সম্বন্ধে এইরুপ জ্ঞানই সম‍্যক দর্শন জ্ঞান।

কঙ্ক্ষাবিতরণ জ্ঞান:-

মানুষ কিনা , সত্ত্ব কিনা , প্রাণী কিনা, পুরুষ কিনা, স্ত্রী কিনা, দেবতা কিনা, পশু কিনা, পাখি কিনা, প্রেত কিনা – এইরুপ মনে সংশয় না এনে সব কিছুকে নি:সংশয়ে “নামরুপ” বলে জানাই কঙ্ক্ষাবিতরণ জ্ঞান বা সংশয় দূরীকরণ জ্ঞান।যেমন : জীব জগতে, তেমন জড় পদার্থের মধ্যে ও পাত্র কিনা, গৃহ কিনা, গাছ কিনা, বাঁশ কিনা, ইট কিনা, পাথর কিনা, সোনা কিনা,রুপো কিনা, সূর্য কিনা, চন্দ্র কিনা, জল কিনা, মাটি কিনা, সমুদ্র কিনা, অরণ‍্য কিনা, পাহাড় কিনা – এরুপ মনে সংশয় না এনে সব কিছুকে নি:সংশয়ে ‘রুপ’ বলে জানার যে জ্ঞান তাই কঙ্ক্ষাবিতরণ জ্ঞান।

এই যথাভূত জ্ঞান , সম‍্যক দর্শন জ্ঞান এবং কঙক্ষাবিতরণ জ্ঞান -এই তিনটি জ্ঞানের মধ্যে শব্দগত বৈষম্য থাকলেও আসলে অর্থগত তেমন কোন বৈষম্য নেই। ৩টি শব্দই সমার্থ বাচক। সেই জন‍্য বুদ্ধ বলেছেন –

“যঞ্চ যথাভূতঞাণং যঞ্চ সম্মাদস্সনং ( যঞ্চ) কঙক্ষাবিতরণা – ইমে ধম্মা একত্থা ব‍্যঞ্জনমেব নানং’তি।

ইমিনা পন ঞাণেন সমন্নাগতো বিপস্সকো বুদ্ধসাসনে লদ্ধসদ্ধো লদ্ধপতিট্ঠিতো নিযতগতিকো চুলসোতাপন্নো নাম হোতি।”

এইরুপ জ্ঞানসম্পন্ন বিদর্শক ব‍্যক্তিই বুদ্ধ শাসনে শ্রদ্ধালাভকারী , প্রতিষ্ঠালাভকারী, নিয়তগতিসম্পন্ন এবং ক্ষুদ্র স্রোতাপন্ন হয়েছে বলে ধরে নিতে হয়।

অতএব, নাম এবং রুপ – এই দুটোই কেবল বার বার উৎপন্ন এবং নিরুদ্ধ হচ্ছে -এটা জেনে একদিন বেঁচে থেকে ও শ্রেয়, না জেনে একশত বছর বেঁচে থাকা অপেক্ষা। এই নামরুপের উৎপত্তি হওয়া এবং নিরুদ্ধ হওয়াকে শুধু মনে মনে জানলেই হবে না, এগুলোকে প্রত‍্যক্ষভাবে জানতে হবে। জানতে হবে যে , শুধু নাম উৎপন্ন হয় না এবং শুধু রুপ উৎপন্ন হয় না – নাম এবং রুপ দুটোই উৎপন্ন হয়।

মনে করাটাকে বলা হচ্ছে ‘উৎপন্ন হচ্ছে’। যতবার মনে করা হচ্ছে ততবার নামরুপ উৎপন্ন হচ্ছে। যতবারই উৎপন্ন হচ্ছে ততবারই নিরুদ্ধ হচ্ছে। কোথায় উৎপন্ন হচ্ছে এবং কোথায় নিরুদ্ধ হচ্ছে বলতে গেলে বলা যায়:

১) চোখে উৎপন্ন হয়ে চোখেই নিরুদ্ধ হয়।

২) কর্ণে উৎপন্ন হয়ে কর্ণেই নিরুদ্ধ হয়।

৩) নাসিকায় উৎপন্ন হয়ে নাসিকাতেই নিরুদ্ধ হয়।

৪) জিহ্বায় উৎপন্ন হয়ে জিহ্বাতেই নিরুদ্ধ হয়।

৫) কায়ে উৎপন্ন হয়ে কায়েই নিরুদ্ধ হয়।

৬) মনে উৎপন্ন হয়ে মনেই নিরুদ্ধ হয়।